গণিতে এমএসসি শেষ করে উদ্যোক্তা তছলিমা: ‘প্রিমি ফার্ম’ ও আচারের ঘ্রাণে ছড়াচ্ছে সাফল্যের সুবাস

নিজস্ব প্রতিবেদক, সৈয়দপুর (নীলফামারী)

স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া, আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন ছিল অদম্য ইচ্ছা ও কঠোর পরিশ্রম। নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর (বকসাপাড়া) এলাকার এক হার না-মানা নারী উদ্যোক্তার নাম উম্মে তছলিমা আকতারী। যিনি তাঁর মেধা আর শ্রম দিয়ে নিজেকে শুধু স্বাবলম্বীই করেননি, তৈরি করেছেন কয়েক ডজন মানুষের কর্মসংস্থান।

শিক্ষাজীবন থেকে উদ্যোক্তার পথে:

২০০৭ সালে এসএসসি এবং ২০১৫ সালে গণিতে এমএসসি সম্পন্ন করা তছলিমা পড়াশোনা শেষে গতানুগতিক চাকরির পেছনে ছোটেননি। মনের কোণে লালিত উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নকে প্রাধান্য দিয়ে স্বামীর সরকারি চাকরির সঞ্চিত অর্থ থেকে শুরু করেন গরু পালন। গ্রামাঞ্চলে প্রথমে ১-২টি গরু বর্গা দিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে তাঁর খামারে গরুর সংখ্যা ১০টিতে উন্নীত হয়েছে। শুধু তাই নয়, এলাকার ১৫-২০ জন খামারিকে গরু পালনের সুযোগ দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে গরু কিনে নিয়ে তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করছেন তিনি।

প্রশিক্ষণ ও ‘প্রিমি ফার্ম’-এর যাত্রা:

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর সৈয়দপুর থেকে গরু মোটাতাজাকরণ বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে ঋণের মাধ্যমে খামারের পরিধি বাড়ান তছলিমা। গড়ে তোলেন তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান “প্রিমি ফার্ম”। এর মূল লক্ষ্য—ভোক্তাদের কাছে নিরাপদ ও হালাল উপায়ে প্রক্রিয়াজাত গরুর মাংস পৌঁছে দেওয়া। নিজস্ব স্লটারহাউজে সম্পূর্ণ হাইজেনিক পদ্ধতিতে গরু জবাই করে অনলাইন ও অফলাইনে সরবরাহের পাশাপাশি তিনি তৈরি করছেন তাঁর সিগনেচার পণ্য—গরুর মাংসের আচার। এই বিশেষ আচার এখন অনলাইনের মাধ্যমে দেশজুড়ে সমাদৃত।

সাফল্যের ধারাবাহিকতায় তছলিমা এখন উৎপাদন করছেন তেঁতুল, বড়ই, জলপাই, রসুন, চালতা ও টমেটোসহ নানা পদের আচার। দেশীয় ঘানিতে ভাঙানো খাঁটি সরিষার তেল এবং নিজস্ব মলা দিয়ে তৈরি এসব পণ্য খুচরা ও পাইকারি দরে সরবরাহ করা হচ্ছে সারাদেশে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে তাঁকে স্থাপন করতে হয়েছে নতুন কারখানা।

উম্মে তছলিমা আকতারী আজ কেবল একজন সফল ব্যবসায়ী নন, তিনি একজন সমাজ সংস্কারকও। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে ২৫-৩০ জন নিয়মিত কর্মী এবং মৌসুমভেদে প্রায় ৫০ জন মানুষ কাজ করেন। আশেপাশের পিছিয়ে পড়া নারী এবং ঝরে পড়া তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়ে তিনি এলাকায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

​স্বামীর পদের ওপর নির্ভর না করে নিজের মেধা ও পরিশ্রমে তৈরি করা এই পরিচয় আজ তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তছলিমা আকতারীর এই গল্প এখন উত্তরবঙ্গের হাজারো নারীর জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *