সৈয়দপুরে নোটিশ না দিয়েই বসতঘর থেকে উচ্ছেদ করায়
খোলা আকাশের নিচে অর্ধশতাধিক মানুষের মানবেতর জীবন


সংবাদদাতা, সৈয়দপুর, নীলফামারী, ৭ নবেম্বর॥ এটি সিত্রাং, সিডর, নার্গিস নামের কোন ঘূর্ণিঝড় অথবা ভূমিকম্প বা যুদ্ধের প্রকোপে এমন ধ্বংসযজ্ঞ নয়। বিজ্ঞ আদালতের রায়ের নোটিশ না দিয়েই আকস্মিক ২৬ টি আধাপাকা ঘর, আসবাব ও গাছপালা গুড়িয়ে দিয়েছে প্রশাসন। মাথাগোঁজার ঠাঁই হারিয়ে ঘর হারা পরিবারের প্রায় অর্ধশতাধিক বিভিন্ন বয়ষী মানুষজন তিন দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। সৈয়দপুর উপজেলার বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের মন্ডলপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে।
জানা যায়, ওই এলাকার মৃত একরামুল হকের ছেলে আব্দুল মোতালেব ও তার অন্যন্য ভাইয়েরা মিলে ১০ পরিবার ৫৭ শতক পৈত্রিক জমিতে বসবাস করে আসছেন। তবে পার্শবর্তী খরখরিয়া পাড়ার প্রভাবশালী সামসুল হকের সন্তানরা ওই বসতভিটা জমির মালিকানা দাবী করে বিভিন্ন ভাবে হুমকি দেয়।


এ নিয়ে আব্দুল মোতালেবের বাবা ১৯৯৮ সালে একটি মামলা দায়ের করেন। এরইমাঝে তার বাবা মারা যায়। এই সুযোগে প্রতিপক্ষ মৃত সামসুল হকের ছেলে সাইফুল ইসলাম স্বাধীন, আব্দুস সামাদ খান ও আব্দুস সবুর খান স্থানীয় ভূমি অফিসে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেন। আর কোন নোটিশ না দিয়েই শনিবার (৫ নবেম্বর) দুপুর ১২ টায় প্রায় দেড় শতাধিক ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী, ভুমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ২ টি স্কেভেটর মেশিন দিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় বসতভিটায়।
এসময় বাড়িতে কোন পুরুষ না থাকায় মহিলা ও শিশুরা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হাত পা ধরে কান্নাকাটি করে জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে সময় চাইলেও তারা কর্ণপাত করেনি। মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ২৬ টি ঘর গুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। আসবাবপত্র, ইলেকট্রিক সরঞ্জামাদি, গাছপালাসহ সবকিছুই মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। লুটপাট হয় স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা। এতে প্রায় দেড় কোটি টাকার মালামাল ধ্বংস করা হয়েছে।
এ নিয়ে ঘটনার প্রত্যক্ষ দর্শী ওই এলাকার আব্দুল কাদেরের ছেলে মাসুম রানা জানান, খবর পেয়ে ছুটে এসে দেখি প্রশাসনের সামনে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও ভাড়াটে গুন্ডাসহ প্রতিপক্ষরা রাস্তাায় ব্যারিকেড দিয়ে আশেপাশের লোকজনকে আটকিয়ে রেখেছে এ ধ্বংস যজ্ঞ চালানো হয়। মোতালেব হোসেন জানায়, প্রতিপক্ষের প্রতিহিংসার ১০ টি পরিবারের ২৬ টি ও, গাছপালা। আদালতের রায় পাওয়ার অজুহাতে স্কেভেটর মেশিন দিয়ে মাত্র আধা ঘন্টায় সব তছনছ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।
এতে বসবাসের জায়গা হারিয়েদিন দিন ধরে শীতের রাতে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছে ওই সকল নারী-শিশু-বৃদ্ধ-রোগীরা। তিনি আরও বলেন, তারা আদালতের নির্দেশে দখল বুঝিয়ে দিতে এই অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু কেউই কোন কাগজ দেখাতে পারেননি। মোছা. হোমায়রা খাতুন নাইস বলেন, একেবারে সন্ত্রাসী কায়দায় অত্যাচার করে আমাদেরকে পথে বসানো হয়েছে। অবৈধ অর্থের দাপটে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতিপক্ষরা প্রতিহিংসাবশতঃ এহেন অপকর্ম করেছে।
ঘরবাড়ি, জিনিসপত্র ভেঙে টাকা-গয়না লুটপাট করে ক্ষ্যান্ত হয়নি। যাওয়ার সময় সব গাছপালা কেটে পুরো এলাকাকে ধ্বংসস্তপে পরিণত করে। ওই ওয়াডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ফজলুল হক মঞ্জু বলেন, এলাকায় এভাবে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাধ্যমে এতগুলো মানুষকে বাস্তহারা করা চরম অমানবিক। আদালতের রায় পেয়ে থাকলে তা জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত। এভাবে উচ্ছেদের কোন মানে হয়না। আর অভিযানের বিষয়ে পরিষদ বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আগাম নোটিশ করা হয়নি।
এমনকি সম্পদ রক্ষায় সময়ও দেয়া হয়নি। ইউপি চেয়ারম্যান শাহাজাদা সরকার বলেন, আগে জানতে পারলে স্থানীয়ভাবে বসেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জায়গা দখলমুক্ত করা সম্ভব হতো। এতে এত বিপুল সম্পদের ক্ষতি হতনা। এখনও অভিযানের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে কিছুই জানতে পারিনি। ১০ টি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিস্ব হয়ে পড়েছে।
এটা মানবিক দৃষ্টিতে খুবই ন্যাক্কারজনক হয়েছে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল ইসলাম বলেন, মূলতঃ সৈয়দপুর প্রশাসন কোন অভিযান নয়। বরং যুগ্ম জেলা জজ আদালত, নীলফামারীর অন্য ডিং-০২/২০২১ নং মোকদ্দমার তফসিল বর্ণিত বিত্তে অত্রাদলতের নাজির শ্রী ভগৎ চন্দ্র কর্তৃক ডিক্রিপক্ষ মোছা. আবেদা বেগম কে দখল বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে।
এসময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে দিক নির্দেশনা প্রদানের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছিল। সেকারণেই সেদিন ঘটনাস্থলে আমরা ছিলাম।তিনি আরও বলেন, এজন্য গত ৩১ অক্টোবর জেলা জজ আদালতের নেজারত বিভাগের ভারপ্রাপ্ত জজ এ. কে. এম. জাহাঙ্গীর আলম কর্তৃক একটি আদেশপত্র পাই। এর আলোকেই আদালতের কাজে সহযোগিতা করা হয়েছে মাত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *