ভিক্ষাবৃত্তিতে নয়\ আত্মশক্তিতে বলীয়ান প্রতিবন্ধী ভুট্টো এখন সফল ব্যবসায়ী।

সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধিঃ অচল নিম্নাঙ্গ। প্রায় সময় অনাহারি কাটলেও শুধু খাবারের জন্য কখনই ভিক্ষেবৃত্তিতে জড়াননি। কঠিন আত্মশক্তি, ক্লান্তিহীন শ্রম আর বিশ্বস্ততায় সৈয়দপুরের এতিম প্রতিবন্ধী ভুট্টু আজ সফল ও অনুকরণীয় ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়েছেন।
জানা যায়, সৈয়দপুর শহরের পৌর ৫ নং ওয়ার্ডের মুন্সিপাড়া এলাকার মৃত গোলাম মোস্তফা ও মৃত শাহনাজ বেগম দম্পত্তির ৪ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে জন্ম গ্রহন করেন মো: পারভেজ ওরফে ভুট্ট (৩০)। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সে দ্বিতীয়। জন্মের সময় ভালই ছিল তার শারিরিক অবস্থা। দুই বছর বয়সে হটাৎ একটি পা বাকা হলে তার মা চিকিৎসকের শরনাপন্ন হন।


দির্ঘ ২ বছর পর অবশেষে তার দুটো পা অকেজো হয়ে চলাফেরা বন্ধ হয়ে যায়। উচ্ছন্ন পিতা ঢাকায় দ্বিতীয় বিয়ে করার কিছু দিন পরই মায়ের মৃত্যু হয়। এতে চড়ম সমস্যায় পতিত হন চার ভাই বোন। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী ভুট্টো। নানা ইসলাম ও নানী নুরজাহান বেগমের অভাবের সংসারেই যেতে বাধ্য হন এতিম চার সহদর। সকলে তিন ভাই-বোনকে দেখভাল করলেও ভুট্টুর বিষয়টি জটিল। নিম্নাঙ্গ অচল হওয়ায় আপনজনেরাও বিরক্ত বোধ করতেন। অসহায় ভুট্টু জীবনের ১৬টি বছর চড়ম অবহেলা আর অনাদরে বেড়ে ওঠেন নানীর বাড়িতে। তারা একটু ভাতের জন্য রাস্তার মোড়ে ভিক্ষে করতে বললেও সে যায়নি। সেখানে না গিয়ে একটি রুটি কারখানায় ১২০ টাকা শ্রমের মজুরীতে প্যাকেটিং কাজ করেন। এর দুই বছর পর স্থানীয় তামিম রহমান নামের এক যুবকের সহায়তায় একটি হাতে টানা সাইকেল পেয়ে বিভিন্ন হাট-বাজারের ক্ষুদ্র দোকানিদের কাছে প্রয়োজনীয় মালামাল সরবরাহ ব্যবসা শুরু করেন। শহরে মালামাল কিনে ৪০ থেকে ৫০ মাইল দুরের হাট বাজারে গিয়ে ক্ষুদ্র দোকানির কাছে স্বল্প দরে নগদ চকলেট, বিস্কুট, চানাচুর, রুটি, চুইনগাম, আচারসহ নানা খাদ্য বিক্রি করেন। শীত, গ্রীস্ম কিংবা বর্ষা ঋতুর প্রতিকুল পরিবেশ তাকে আটকাতে পারেনি। এভাবে ৮ বছর ব্যবসা করে দু’টি বোনের বিয়ে দিয়েছেন। তার লেনদেন ভাল হওয়ায় শহরের মহাজনদের কাছে বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। তবে ভাগ্য বদলে যায় মাস দুয়েক আগে। শহরের ১০ নং ওয়ার্ডের সখিনা পাড়ার একটি বাড়িতে রুটি তৈরীর কারখানা পেয়ে। সেখানে রুটি-বিস্কুট কিংবা খাদ্য তৈরীর মজুদ উপকরণ সমৃদ্ধ প্রস্তত কারখানাটির মালিক ভুট্টুকে দিয়ে দেয়।


তামিম জানান, আমি দেখেছি। সে বর্ষাকালে পানিতে ভিজে গভীর রাতে একাকি হাত সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছে। এটি বিস্ময়কর। বাচার জন্য শুধু উচ্চ শিক্ষা, বড় চাকরী, কিংবা বড় পুঁজি দিয়ে কারখানা গড়ে সফল হওয়া যায় না। এর জন্য দরকার আত্মশক্তি ও দৃঢ মনোবল। যা ভুট্টেুর মধ্যে নিহিত।
গত মঙ্গলবার সরেজমিন ওই কারখানায় গিয়ে যায়, দক্ষ কারিগড় দ্বারা চানাচুর, লাচ্ছা সেমাই, পাউরুটি, বুন্দিয়াসহ নানা ধরণের খাদ্য সামগ্রী তৈরী করা হচ্ছে। কেউ বা চুল্লির পাশে। কেউ সয়াবিন দ্বারা খামির করছে লাচ্ছার। আবার কেহ বুন্দিয়া প্যাকেটে ওজন দিয়ে ভরে ভ্যানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বাজারে। প্রতিবন্ধী ভুট্টু তার ট্রাই সাইকেলে পুর্বের ভুষনে বসে। আকবর নামে কারিগড় জানান, এখানে সব মিলিয়ে ১০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। কাজের দক্ষতা অনুযায়ী প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ হাজার চাকা মজুরী দিচ্ছেন। আর অন্যন্য কারখানায় চেয়ে মুল্যায়ন এখানে বেশি।
একান্ত আলাপচারিতায় জানা গেছে ভুট্টুর পঙ্গত্ব জীবন ও তার উত্থানের গল্প। মহাজনদের সহযোগিতায় শত ভাগ নীতিমালা মেনে খাদ্য সামগ্রী তৈরী করছি। স্থানীয় প্রশাসনসহ স্থানিয় জনপ্রতিনিধিগণ উৎসাহ দিচ্ছেন। আবার কতিপয় উচ্ছৃংখল যুবক নানা ভীতি দেখিয়ে সড়কে টাকাও কেড়ে নিয়েছেন। এমন ঘটনায় প্রশাসনকে জানানোর পর তার কারখানায় এখন নিয়মিত টহল দিচ্ছে পুলিশ। তবে এ বিষয়গুলিতে বিচলিত নয় সে। আকাশ ছোয়ার স্বপ্ন নেই তার। মানুষ হিসেবে স্বাভাবিক ভাবে বাচবে এ মানষিকতায় আজ তাকে সফলতার সফলতার সিড়ি বেয়ে উঠতে সহায়ক হয়েছে। যা সচল মানুষের জন্য একজন উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছেন এতিম ও প্রতিবন্ধী এ যুবক।