ফুলবাড়ীতে ঐতিহ্যবাহী চড়ক অনুষ্ঠিত বড়শি গাঁথা পিঠে শূন্যে ঘুরলেন অরবিন্দ রায়।

প্লাবন শুভ, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধিঃ হাজার হাজার মানুষের অপলক চোখ ৩০ ফুট উচ্চতার কাঠের দন্ডের দিকে। একজন মানুষ শূন্যে ঘুরছেন একটি দঁড়িতে ঝুলে। দঁড়িটি বাঁধা ওই মানুষটির পিঠের চামড়ার সঙ্গে গাঁথা বড় দুটি বড়শি। চলছে উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি। বাজছে ঢাকঢোল। ছিটানো হচ্ছে খাজা-বাতাসা ও কলা।


বড়শিতে ঝুলে থাকা অরবিন্দ চন্দ্র রায় (৪৫) তাঁর সঙ্গে থাকা ফুল-জল, আবির, কলা, বাতাসা, নকুলদানা ইত্যাদি ছিটিয়ে দিচ্ছেন অগণিত ভক্ত-দর্শকের দিকে। অরবিন্দ রায় দিনাজপুরের ফুলবাড়ী পৌরএলাকার চাঁদপাড়া গ্রামের মতিলালের ছেলে।
গত বুধবার সন্ধ্যায় দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের আলাদীপুর চড়ক কালী মন্দির প্রাঙ্গণে এ দৃশ্য দেখছে সবাই। সেখানে বসে দুইদিনব্যাপী গ্রামীণ মেলা। করোনার প্রকোপে গত দুইবছর অনুষ্ঠিত হয়নি এই উৎসবটি। দীর্ঘদিন পর এই উৎসবটি হওয়ায় সেখানে বিভিন্ন বয়সী কয়েক হাজার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভক্ত ও দর্শনার্থী সমবেত হন।


চড়ক পূজার উৎসবে আসা নমিতা রানী ও শঙ্কর সাহা বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই চড়ক উৎসবের আয়োজন শুরু হয়। ধর্মানুরাগী ‘সন্ন্যাসীরা’ বাড়ি বাড়ি গিয়ে নৃত্যগীতের মাধ্যমে চড়ক পূজার জন্য চাল ও অর্থ সংগ্রহ করেন। এখানে প্রায় এক যুগের বেশি সময় থেকে এই চরক উৎসবের আয়োজন করা হয়। গত দুইবছর করোনার কারণে চড়ক ঘুরেনি। তাই এবার পরিবার পরিজন নিয়ে উৎসবটি উপভোগসহ মায়ের আরাধনা করতে এসেছি।


উৎসব আয়োজক কমিটির সভাপতি পরিতোষ চন্দ্র রায় ও সম্পাদক কান্তি চন্দ্র সরকার বলেন, চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে পুরো বৈশাখ মাসজুড়ে চড়ক কালী পূজোর আয়োজন করা হয়। তবে আমাদের এই শ্মশানে বৈশাখের ৬ তারিখে এই উৎসবটির আয়েজন করা হয়। গত মঙ্গলবার রাত তিনটায় চড়ক কালীর পূজো অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই পূজোকে কেন্দ্র করে দুইদিনব্যাপী মেলা বসেছে।
আলাদীপুর গ্রামের বাসিন্দা ল²ী রানী ও জয়া রায় বলেন, এই চড়ক মেলা উপলক্ষে আমাদের পুরো গ্রাম উৎসবে মেতে ওঠে। সবাই মেয়ে-জামাইসহ আত্মীয় স্বজনদের আমন্ত্রণ জানায়। তারা আসেন। রাতে কালী পূজো হয়। দিনে মেলা হয়।

মেলাসহ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বসে দোকান। এ মেলা শেষ পর্যন্ত আর হিন্দু সম্প্রদায়ের মেলা থাকে না। এটা এ অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমানের মিলনমেলায় পরিণত হয়।
আয়োজক সূত্র জানা যায়, বড়শিতে বিদ্ধ মানুষকে ঘোরানোর আগে সারা দিন ধরে নানা আচার পালন করা হয়। মানুষ ঘূর্ণনের জন্য পোঁতা কাঠের দন্ডটি মাঠের মাঝখানে বসানো। অনেকটা লাঙলের জোয়ালের মতো আরেকটি কাঠ এই কাঠের ওপর লম্বালম্বিভাবে বসানো। কাঠের মাথায় থাকে মাটি পর্যন্ত ঝোলানো কয়েকটি লম্বা দঁড়ি। কাঠের দন্ডের ঠিক নিচে একদল মানুষ শক্ত হাত দিয়ে ঘোরান দঁড়িগুলো। এটাই চড়ক পূজার মূল আকর্ষণ।
বড়শিতে ঝুলে থাকা অরবিন্দ চন্দ্র রায় বলেন, দীর্ঘ ১০ বছর থেকে দেশের বিভিন্নস্থানে এই কাজ করছেন তিনি। তার পিঠে অগণিত ছিদ্র রয়েছে। প্রত্যেকবার পিঠের ভিন্ন ভিন্নস্থানে ছিদ্র করে বড়শির কল লাগানো হয়। এটি করতে বেশ সাধনার প্রয়োজন।