দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী মুগ,খেসারি ও বেসনের তৈরি পাপড়। 

এনামুল মবিন(সবুজ), স্টাফ রিপোর্টারঃ মুখরোচক খাবার পাপড় তা যদি হয় দিনাজপুরের তবে তো কোন কথাই নেই। দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী মুগ, খেসারি ও বেসনের তৈরি পাপড়ের কথা শুনলে কারনা জিভে জল আসে। সুস্বাদু আর মুখরোচক হওয়ায় একসময় এর চাহিদা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে। রাজা-বাদশাদের খাদ্যতালিকায়ও ছিল এই পাপড়। দিনাজপুরের এ পাপড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় কয়েকশত বছরের ইতিহাস।

পুরোনো ঝাঁকড়া বট গাছের নিচে বসা ছোট ছোট দোকানে ভাজা হয় মুগের পাঁপড়। ওপরে ছিটিয়ে দেওয়া হয় হালকা ঝাল বিট লবণ। খাওয়া হয় সাবধানে, যাতে ভেঙে না যায়। পুরো বছর এ দৃশ্য দেখা যায় এ জেলার গ্রামগঞ্জের প্রায় প্রতিটি হাটবাজারে। আর মেলায় তো কথাই নেই। দিনাজপুর জেলার মেলাগুলো যেন পাঁপড়ের দোকান ছাড়া জমে ওঠে না। পাঁপড় দিনাজপুর অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতির ঐতিহ্য।
দিনাজপুরে বাসা হওয়ায় বাহারি আর বিভিন্ন আকারের পাঁপড় তৈরির দৃশ্য ছিল অতিপরিচিত। কোথাও ঘুরতে যাওয়া কিংবা স্কুলের টিফিনে একটি আধুলি কিংবা ১ টাকার কয়েন দিয়ে বড় একখানা পাঁপড় কিনে তা অল্প অল্প করে অতি সাবধানে ভেঙে খাওয়ার দৃশ্য এখনো শৈশবকে মনে করিয়ে দেয়। সরু সুগন্ধি চাল, লিচু আর কাটারিভোগ চালের চিড়ার পাশাপাশি দিনাজপুরের পাঁপড়ের চাহিদা এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও তৈরি হয়েছে।


দিনাজপুর শহরের চকবাজার, নতুনপাড়া, বাসুনিয়াপট্টি, চুড়িপট্টি, রাজবাড়ি, গুঞ্জাবাড়ি, ফকিরপাড়া, বড় বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয় পাঁপড়। সাধারণত মসুর, ছোলা, মাষকলাই, চাল, আলু ইত্যাদির গুঁড়ো ও খামি থেকে এটি বানানো হয়। তবে দিনাজপুরের মুগ ও খেসারির ডাল এবং বেসনের পাঁপড় বেশ বিখ্যাত। সারা দেশের নিরামিষাশীদের মধ্যে মুগ ডালের পাঁপড়ের চাহিদা ব্যাপক। মূল উপাদান ডাল হলেও পাঁপড়ের স্বাদে বৈচিত্র্য আনতে খামিরের সঙ্গে জিরা, মরিচ, বাদাম কিংবা কালিজিরা মেশানো হয়।
দক্ষিণ ভারতের এই খাবার দিনাজপুরে কীভাবে প্রচলিত হলো, তার বিভিন্ন গল্প শোনা যায় লোকমুখে। এটাও জানা যায়, দিনাজপুরের রাজপরিবারের খাদ্যতালিকায়ও ছিল মুগের পাঁপড়। ফলে এই অঞ্চলে পাঁপড়ের ইতিহাস যে কয়েকশত বছরের পুরোনো, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।


পাঁপড় দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করা গেলেও এখন পাঁপড় মুখরোচক নাশতার অন্যতম অনুষঙ্গ। শরতের স্নিগ্ধ বিকেলে হোক বা দুরন্ত শীতের দিন, চায়ের সঙ্গে পাঁপড় ভাজা কিংবা পাঁপড় ভেঙে দিয়ে মুড়িমাখা অথবা এমনি এমনি ভাজা পাঁপড় খাওয়া এক অন্য আবেশ তৈরি করে।
দিনাজপুরের পাঁপড় এখন ঢাকা সহ সারা দেশে পাওয়া যায়। বিভিন্ন সুপারস্টোরে তো বটেই, বড় মুদি দোকানেও কেজি হিসেবে বিক্রি হয় এটি
পাপড় তৈরি শ্রমিক লতা রানী এপিএন টিভি কে বলেন,সংসারের কাজের পশাপশি প্রায় ৫ থেকে ৬ বছর ধরে পাপড় তৈরির কাজ করি।বাড়ির কাজ শেষে দিনে দেড় থেকে ২০০ টাকার পাপড় ডলতে পারি কিন্তু সমস্য হচ্ছে আমরা যারা পাপড় তৈরি শ্রমিক তাদের পাপড় ডলতে রোদে শুকাতে খুব কষ্ট হয় । খেলা যায়গায় পাপড় শুকাতে হয়ে অনেক সময় ধুলা বালি মাছি আবার বৃষ্টিহলে আমার পড়ি বিপদে ।আমার চাই পাপড় তৈরি জন্য যদি কারখানা থাকত তহলে আমাদের জন্য ভলো হত সেখানে ধুলা মাছি বসতে পাড়ত না বৃষ্টি হলে ভিজে যাইতো না।


পাপড় তৈরি শ্রমিক শ্যমলি রানি এপিএন টিভি কে বলেন,প্রায় ১০ বছরের বেশি সময় ধরে পাপড় তৈরির কাজ করে আসছি আগে ১০০ পাপড় ডলে ১০ টাকা দিতো ব্যবসায়িরা এখন ১০০ পাপড় ডলে ২৫ টাকা দেয় কিন্তু তাতেও আমাদের পোষায় না ।বাজারের সব জিনিসের দাম বাড়তি কিন্তু আমাদের পাপড় শ্রমিকদের দাম বাড়ছে না।
দিনাজপুর চকবাজার এলাকার পাপড় ব্যবসায়ি দুলাল মিয়া এপিএন টিভি কে বলেন,দিনাজপুরে চকবাজার এলাকায় সবছেয়ে বেশি পাপড় তৈরি হয় দিনাজপুরে আমরা প্রায় ৩০ জন পাপড় ব্যবসায়ি আছি সারা বাংলাদেশ আমরাই পাপড় সাপ্লাই দিয়ে থাকি । আমরা পাপড় ব্যবসায়িরা কয়েকবার চেষ্টা করেও দেশের বাহিরে পাপড় রপ্তানি করতে পারি নাই।দিনাজপুরে পাপড় তৈরির সাথে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার তারা সকলেই নারি শ্রমিক হওয়ায় সংসারের পাশাপশি বাড়তি ইনকাম করতে পাপড় তৈরি করে।সরকারি সহযোগিতা পেলে পাপড় বাহিরের দেশে রপ্তানি করা সম্ভব।
মুগের পাঁপড় প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা আর মাষকলাই এবং অন্যান্য ডালের পাঁপড় ১১০ থেকে ১৩০ টাকা দামে বিক্রি হয়। ঢাকায় এর দাম কিছুটা বেশি।