তারাগঞ্জে মাল্টা ও কমলা চাষে নিরব বিপ্লব।

আশরাফুল ইসলাম, প্রতিনিধি তারাগঞ্জ (রংপুর) চারদিকে আম, জাম, কাঁঠালসহ নানান দেশীয় ফলের মৌ মৌ গন্ধে বাতাস সুবাসিত। বাংলাদেশে সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল তথা মধ্য মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত মধুমাস ধরা হয় এবং এসময়ই নানান দেশীয় ফলের প্রাচুর্য থাকে। বছরের অন্যান্য সময়ে এত বেশি দেশীয় ফল পাওয়া যায় না। তারাগঞ্জের স্থানীয় এবং ছোট-বড় পাইকারি বাজারগুলোতে দেশী ফলের সমাহার। এর মাঝেই আরেকটি গাঢ় সবুজ বর্ণের ফল গাছে গাছে শোভা পাচ্ছে। এটি দেশীয় জাতের মাল্টা যা বারি মাল্টা-১ নামে পরিচিত। এই ফলের নিচের দিকে গোলাকার পয়সা সদৃশ একটি সুস্পষ্ট চিহ্ন থাকে বিধায় একে পয়সা মাল্টা নামেও অভিহিত করা হয়। বিগত কয়েকদিনে তারাগঞ্জের সবকটি ইউনিয়ন ঘুরে প্রায় সবত্রই এই জাতের মাল্টা বাগান চোখে পড়েছে। কিছু কিছু বাগানে এবছর ফলও ধরেছে।


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, তারাগঞ্জ সূত্রে জানা যায়, তারাগঞ্জ উপজেলায় মাল্টা চাষ ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো লেবু জাতীয় ফসলের সম্প্রসারণ, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় কিছু আগ্রহী কৃষকদেরকে বারি মাল্টা-১ জাতের মাল্টার প্রদর্শনী দেয়া হয়। পরের বছর মাল্টার পাশাপাশি দার্জিলিং, চাইনিজ ও বারোমাসি ভিয়েতনামী জাতের কমলার প্রদর্শনী দেয়া হয়। অনেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে মাল্টা চাষের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। এযাবৎ এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৩ হেক্টর জমিতে মাল্টা ও কমলা চাষ সম্প্রসারণ হয়েছে।


প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত বিভিন্ন বাগান ঘুরে দেখা যায়, ২০১৯ সালের স্থাপিত মাল্টা বাগানগুলোর সবকটিতেই প্রায় শতভাগ গাছে এবছর ফল ধরেছে। কিসামত মেনানগরের ইলিয়াস কাঞ্চন, ইকরচালীর মাহবুবর রহমান, চড়কডাঙ্গার ফরতাজুল ইসলাম, রহিমাপুরের খানসাহেরপাড়ার হারুন-অর-রশিদ, সয়ার মন্ডলপাড়ার মন্ডল, ভীমপুরের হোসেন, কুর্শা মাস্টারপাড়ার আমজাদ হোসেনের বাগানে থোকায় থোকায় মাল্টা ধরেছে। আকার ভেদে প্রতিটি গাছে প্রায় ৩০-১০০ টি ফল ধরেছে এবং বাড়ন্ত ফলের ভারে ইতোমধ্যেই গাছগুলো প্রায় নতো হয়ে পড়েছে। এছাড়াও এবছর প্রথমবারের মতো কয়েকটি দার্জিলিং জাতের কমলা বাগানে কমলা ধরেছে। কৃষকরা জানান, কৃষি অফিসের পরামর্শে এবং সঠিক যত্ন ও পরিচর্যায় মাল্টা চাষে তারা সফল হয়েছেন। বাগানে দেশী মাল্টা ও কমলার এমন ফলন দেখে এলাকাবাসীও আশান্বিত হচ্ছেন এবং নিজেরা মাল্টা চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।


উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাসেল সরকার জানান, আমাদের দেশে সাধারণত সেপ্টেম্বর মাসের দিকে দেশী ফল তেমন থাকে না এবং এসময়েই (সেপ্টেম্বর- অক্টোবর) মাল্টা পরিপক্ক হয় বিধায় মাল্টাচাষীরা এর মাধ্যমে লাভবান হতে পারেন এবং পাশাপাশি জনগণের পুষ্টির ঘাটতি পূরণে মাল্টা বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। মাল্টা নন-ক্লাইমেকটেরিক ফল বিধায় গাছ থেকে সংগ্রহ করার পর তা আর পাকে না, এজন্য অক্টোবর মাসে মাল্টা সবচেয়ে রসালো ও মিষ্টি হওয়ায় তিনি এসময় মাল্টা বাজারজাতকরণের পরামর্শ দেন।


উপজেলা কৃষি অফিসার ঊর্মি তাবাসসুম বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে দেশীয় জাতের মাল্টা (বারি মাল্টা-১) ও কমলা চাষে নিরব বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে। প্রকল্পের মাধ্যমে আগ্রহী ও উদ্যমী কৃষকদেরকে চারা, সার, বালাইনাশকসহ অন্যান্য উপকরণ সহায়তা এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও নিয়মিত বাগান পরিদর্শনের মাধ্যমে কৃষককে যথাসময়ে সঠিক পরামর্শ প্রদানের ফলে মাল্টা ও কমলা চাষে সফলতা এসেছে। কৃষকদের সফলতা দেখে আগামী দিনে তরুণ উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে তারাগঞ্জ উপজেলায় বানিজ্যিক আকারে মাল্টা ও কমলা চাষ আরো সম্প্রসারিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মাল্টা চাষী মাহবুবর রহমান বজু জানান, আমি ২০২১ সালে ১ একর বাগানে কয়েকটি গাছে প্রথমবারের মতো ১৫০ কেজি মাল্টা পেয়েছি। এ বছর ব্যাপক ফলনের আশা করছি, এর পাশাপাশি বারি মাল্টা-১ এর ৫০০০ এবং দার্জিলিং কমলার ১০০০ গ্রাফটিং চারা উৎপাদন করছি। যা থেকে সারা বছরব্যাপী বাড়তি আয় কনা সম্ভব হবে। এছাড়াও উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের রহিমাপুর খান সাহেব পাড়ার হারুন-অর-রশিদ গতবছর প্রায় ৫০ হাজার টাকার মাল্টা বিক্রি করেছেন। এ বছর দেড় লক্ষ টাকার ফল বিক্রির ব্যাপারে আশাবাদি।
এ বছর রংপুর জেলার সবচেয়ে বড় প্রায় ৭ বিঘার মাল্টা ও কমলার মিশ্র বাগান তারাগঞ্জে দামোদরপুরে গড়ে উঠছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *